সর্বশেষ আপডেট

ঝড়-জোয়ার-দারিদ্র্যের ফাঁদে বরগুনার জেলেরা

  • আপডেট হয়েছে : Saturday, December 6, 2025
  • 617 বার দেখেছেন

জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা,বরগুনা:

উপকূলীয় জেলা বরগুনার হাজারো জেলেদের জীবন আজও এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। বঙ্গোপসাগরে মাছের প্রাচুর্য থাকার পরও সেই প্রাচুর্য তাদের ঘরে সচ্ছলতা এনে দিতে পারছে না। বরং প্রতিটি সমুদ্রযাত্রাই যেন নতুন করে তৈরি করছে অনিশ্চয়তা, নতুন ঋণ আর নতুন ঝুঁকি। বছরের পর বছর সমুদ্রে জীবন বাজি রেখে কাজ করলেও দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা এখানকার জেলেদের বাস্তবতা।

পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী, বামনা ও সদর উপজেলার ঘাটগুলোতে প্রতিদিনই ভোরের আলো ফুটতেই জেলেরা ট্রলার প্রস্তুত করেন। আবহাওয়া ভালো-মন্দ দেখার সুযোগ খুব কমই থাকে তাদের। দিনের পর দিন ঘরে উপার্জন না থাকলে সন্তানের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বৈরী আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের সতর্কতা উপেক্ষা করেই অনেক সময় সমুদ্রে পাড়ি জমাতে হয়।

জেলেদের অন্যতম অভিযোগ, সময়মতো ‌সতর্ক সংকেত তাদের কাছে পৌঁছায় না। উপকূলজুড়ে আবহাওয়া বার্তা প্রচারের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। এর প্রভাব দেখা যায় প্রতি বছরই। ডুবে যায় একাধিক মাছ ধরার ট্রলার, হারিয়ে যান জেলে। নিখোঁজ জেলেদের স্ত্রী-সন্তানেরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানবিক সংকটে ভুগতে থাকেন। অনেকেই দাদনের ঋণ শোধের দায়ে আরও গভীর দুর্দশায় পড়েন।

জেলে হযরত আলী জানান, ‘মাছ ধরতে পারলে কিছু পাই, কিন্তু ঘরের খরচ তুলতেই শেষ হয়ে যায় সব। তার ওপর ঝড়-জোয়ারের খবর আগে থেকে জানতে পারলে ভালো, কিন্তু আমরা অনেক সময় দেরিতে শুনি।’

এমন অভিজ্ঞতা প্রায় সব জেলেরই। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার মতো নৌযান বা সুরক্ষা সরঞ্জামও অনেক ট্রলারে নেই। লাইফ জ্যাকেট, জিপিএস, জরুরি যোগাযোগ যন্ত্র- এসবের অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।

অন্যদিকে ট্রলার মালিকদেরও রয়েছে নিজস্ব সংকট। জাল, দড়ি, নোঙর, বরফ, তেল, শ্রমিক মজুরি সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, তা তাদের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত জেলেদের ন্যায্য আয়ের অংশও কমে যায়।

এই পরিস্থিতেই জেলেদের আরও একটি বড় বোঝা মহাজনি ঋণ বা দাদন। অধিকাংশ জেলে মৌসুম শুরুর আগে ঋণ নিতে বাধ্য হন, আর এই ঋণের সুদ ও শর্ত এতটাই কঠোর যে তা শোধ করতেই বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে অনেকেই জীবনের পুরোটা সময় দাদনের ফাঁদে আটকে থাকেন।

জেলায় মৎস্য বিভাগ দাবি করছে, জেলেদের স্বাবলম্বী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, লাইট হাউজ, বিশ্রামাগার নির্মাণ, বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে বকনা বাছুর, ছাগল ও খাদ্য সহায়তা প্রদান- এসবই তাদের জন্য সহায়ক। তবে জেলেদের মতে, চাহিদা ও প্রয়োজনের তুলনায় এই সহায়তা এখনও খুবই সীমিত।

এদিকে বরগুনার একমাত্র নিবন্ধিত নারী জেলে লাইলী বেগমের দৃঢ়তা উপকূলে অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমাজের বাঁধা উপেক্ষা করে সমুদ্রে মাছ ধরে জীবনযাপন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে নারীরাও পেশাগতভাবে যে কোনো ক্ষেত্রেই সমান দক্ষ।

স্থানীয় মৎস্যজীবী সংগঠনগুলোর মতে, জেলেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে মোবাইল ভিত্তিক সতর্কীকরণ সেবা, সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণ, স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান, ডিজেলের মূল্য সহনীয় করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তবেই দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্তি পেতে শুরু করবেন তারা।

সব মিলিয়ে বরগুনার জেলেরা এখনো লড়াই করছেন ঝড়-জোয়ারের প্রকোপ, ঋণের দুষ্টচক্র, সুরক্ষার অভাব এবং অনিশ্চিত আয়ের বিরুদ্ধে। প্রতিদিনই তারা জীবন বাজি রেখে ছুটে যান উত্তাল সমুদ্রে, শুধু এই আশায়- একদিন হয়তো পরিস্থিতি বদলাবে। সাগরের প্রাচুর্যের মতোই ভরে উঠবে তাদের ঘরও।

এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!