সর্বশেষ আপডেট

বরগুনার পর্যটনে নতুন মাত্রা সুরঞ্জনা: প্রতিনিয়ত পর্যটকের ভিড়

  • আপডেট হয়েছে : Saturday, December 6, 2025
  • 639 বার দেখেছেন
default

জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা, বরগুনা:

উপকূলীয় জেলা বরগুনার ঢলুয়া ইউনিয়নের নির্জন নদীপাড় আজ পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম। বিষখালী ও খাকদোন নদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠা ইকো-ট্যুরিজম স্পট ‘সুরঞ্জনা’ এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। দুই বছর আগেও যেখানে হাওয়া আর পাতি শৃগালের ডাক ছাড়া কোনো মানুষের উপস্থিতি ছিল না, আজ সেই নির্জনতা ভেঙে প্রতিদিনই হাজারো মানুষের আনা গোনা।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সুরঞ্জনা গড়ে তুলেছেন অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ। শুরুর দিকে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, অবকাঠামো সংকট, আর্থিক চাপ, সব বাধা ডিঙিয়ে তিনি এগিয়ে যান নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে।
তাঁর ভাষায়, বরগুনাকে নতুনভাবে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরার ইচ্ছা থেকেই সুরঞ্জনার জন্ম। আমি শুধু একটি জায়গা নয়, বরং প্রকৃতি উপভোগের নিরাপদ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চেয়েছি।
বর্তমানে সুরঞ্জনায় গড়ে উঠেছে ছায়াঘেরা হাঁটার পথ, সবুজ বাগান, নদীপাড়ে বসার ডেক, ছবি তোলার স্পট, নৌভ্রমণের সুযোগ এবং প্রশিক্ষণ ও সেমিনারসহ নানাবিধ অনুষ্ঠান করার জন্য নির্মাণাধীন আধুনিক মিলনায়তন। বিশেষ করে শরৎ আসলে কাশবনের সৌন্দর্য এক অনন্য রূপ নেয়। বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুল, নদীর ঢেউ আর দিগন্তজোড়া নীরবতায় মুগ্ধ হয়ে যান দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়দের মতে, সুরঞ্জনা গড়ে ওঠার পর ঢলুয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে গেছে। আগে সন্ধ্যা নামলেই নির্জন হয়ে পড়া এলাকায় এখন প্রতিদিনই মানুষের ভিড় জমে। কেউ নৌকা চালাচ্ছেন, কেউ খাবারের দোকান চালু করেছেন, কেউ বা ছবি তোলার কাজ করছেন। ঢলুয়ার বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন,আগে দিনে ৫০ টাকা রোজগার হতো না। এখন ছুটির দিনে শত শত পর্যটক আসে, একদিনেই কয়েকগুণ আয় হয়।
অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ মনে করেন, সুরঞ্জনা শুধু বিনোদনের কেন্দ্র নয়, বরং স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র। তিনি বলেন, এ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষ যুক্ত না হলে এটি টেকসই হবে না। তাই আশপাশের তরুণদের কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। রিসোর্ট পুরোপুরি চালু হলে কয়েকশো মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
তিনি আরও বলেন, এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, নদীপথের নিরাপত্তা, স্থায়ী জেটি, পর্যাপ্ত পার্কিং, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। সরকারি সহযোগিতা পেলে সুরঞ্জনাকে দক্ষিণাঞ্চলের শীর্ষ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
বরগুনা জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, সুরঞ্জনার মতো পরিবেশবান্ধব বেসরকারি উদ্যোগ বরগুনার পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রচারণা বাড়ানো গেলে এটি বৃহৎ পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
বরগুনার পর্যটনে সুরঞ্জনার আরেক নতুন মাত্রা—মাসব্যাপী শরৎ উৎসব। বরগুনা জেলা পর্যটন উদ্যোক্তা উন্নয়ন কমিটি ও ‘সুরঞ্জনা’ যৌথভাবে সুরঞ্জনার কাশবনে এ উৎসব আয়োজন করেছে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ঢল নামছে কাশবনে। আঞ্চলিক লোকসংগীত, প্রদর্শনী, নৌভ্রমণ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং কাশবন ঘিরে সাংস্কৃতিক আয়োজন, সব মিলিয়ে উৎসব এখন পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরগুনার প্রাকৃতিক সম্পদ বনাঞ্চল, নদীপথ, কাশবন ও উপকূল ইকো-ট্যুরিজমের বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। সুরঞ্জনার উদাহরণ দেখাচ্ছে কীভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগ একটি নির্জন এলাকাকে দেশের আলোচিত পর্যটন গন্তব্যে রূপ দিতে পারে। সুষ্ঠু অবকাঠামো নির্মাণ, প্রচারণা ও সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ইকো-ট্যুরিজম স্পটে পরিণত হতে পারে।
আজ উপকূলের শান্ত জনপদের বুক চিরে গড়ে ওঠা সুরঞ্জনা শুধু একটি ভ্রমণ স্পট নয়, এটি স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও এক অঞ্চলের পরিচয় বদলে দেওয়ার প্রতীক। উদ্যোক্তার স্বপ্ন, স্থানীয়দের অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতির উদারতার মিলেই সুরঞ্জনা বরগুনার পর্যটনের নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে।
শাহ্/জা/জ
এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!