উপকূলীয় ঝড়-বৃষ্টি, জোয়ার-ভাটা, পায়রার খরস্রোতা বাতাস আর বঙ্গোপসাগরের নোনা ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই তিন শতাধিক বছর ধরে বেঁচে আছে বরগুনার রাখাইন সম্প্রদায়। একদিন নৌকা নির্মাণ, তাঁতশিল্প, কাঠের কাজ, হস্তশিল্প আর বৌদ্ধ ধর্মীয় কিয়াংয়ের আলোয় আলোকিত ছিল এই জনপদ। আজ সেই পল্লীগুলো নীরব, ক্লান্ত, ভগ্ন। জীবিকার পথ বন্ধ, জমিজমা কমে এসেছে, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে পরিবার। প্রাচীন সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ভাষা সবই যেন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে।
রাখাইন পল্লীতে ঢোকা মাত্রই দেখা যায়, ঘরে ঘরে অভাবের ছায়া। অনেকে দিনের তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে পারছে না। একসময়ের জমজমাট নৌকা নির্মাণ শিল্পে আজ মানুষ নেই, অর্ডার নেই, নেই সেই ব্যস্ততা। হস্তচালিত তাঁত একসময় বরগুনার বাজার মাতিয়ে রাখত, আজ সুতার দাম, পরিবহন সমস্যায় সেই তাঁত মৃতপ্রায়। বাজার সংকুচিত, পর্যটক নেই, তাই হাতে বানানো কাপড়, ব্যাগ, শোপিস বিক্রি হচ্ছে না। বহু পরিবার তাই কর্মহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছে।
রাখাইন ভাষা শিক্ষা প্রায় দাঁড়িয়ে গেছে মৃতপ্রায় অবস্থায়। অতীতে প্রতিটি পাড়ায় কিয়াং থাকত, ভাষা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। সরকারি সহায়তা না থাকায় সেসব ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন প্রায় নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা বলতে পারে, কিন্তু লিখতে পারে না, এ যেন সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তির ক্ষয়। অথচ তিনশ বছরের ইতিহাস বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই জনগোষ্ঠী। তাদের ঘরবাড়ি, বিহার, পাহাড়ি নকশার ঘর, হস্তচালিত তাঁতের শব্দ, কাঠের নৌকা সবই বরগুনার ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সেই মানুষগুলো এখন নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে বাঁচছে। কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান নেই, জমি দখল, মামলা-মোকদ্দমা, যোগাযোগ সমস্যা সব মিলিয়ে তারা এক অবিরাম সংগ্রামের ভেতর বাস করছে।
একদিন যারা নীল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আরাকান থেকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল, তারা আজ স্বপ্নহারা হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। অথচ তারা ভিক্ষুক নয়, তারা পরিশ্রমী, মর্যাদাবান একটি জাতিগোষ্ঠী। তারা শুধু টিকে থাকার সুযোগ চায়। চায় নিজস্ব শিল্পকে বাঁচানোর সুযোগ, ভাষাকে রক্ষার সুযোগ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ।
যদি এখনই টেকসই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে প্রাচীন রাখাইন জনপদ, তাদের শিল্প-সংস্কৃতি, ভাষা আর তিন শত বছরের মানবিক বর্ণিল ইতিহাস সবই অচিরে হারিয়ে যাবে উপকূলের নোনা পানিতে।