সর্বশেষ আপডেট

বরগুনার ঐতিহ্যবাহী রাখাইন জনপদ বিলুপ্তির হুমকিতে

  • আপডেট হয়েছে : Saturday, December 6, 2025
  • 797 বার দেখেছেন

জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা, বরগুনা:

উপকূলীয় ঝড়-বৃষ্টি, জোয়ার-ভাটা, পায়রার খরস্রোতা বাতাস আর বঙ্গোপসাগরের নোনা ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই তিন শতাধিক বছর ধরে বেঁচে আছে বরগুনার রাখাইন সম্প্রদায়। একদিন নৌকা নির্মাণ, তাঁতশিল্প, কাঠের কাজ, হস্তশিল্প আর বৌদ্ধ ধর্মীয় কিয়াংয়ের আলোয় আলোকিত ছিল এই জনপদ। আজ সেই পল্লীগুলো নীরব, ক্লান্ত, ভগ্ন। জীবিকার পথ বন্ধ, জমিজমা কমে এসেছে, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে পরিবার। প্রাচীন সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ভাষা সবই যেন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে।

রাখাইন পল্লীতে ঢোকা মাত্রই দেখা যায়, ঘরে ঘরে অভাবের ছায়া। অনেকে দিনের তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে পারছে না। একসময়ের জমজমাট নৌকা নির্মাণ শিল্পে আজ মানুষ নেই, অর্ডার নেই, নেই সেই ব্যস্ততা। হস্তচালিত তাঁত একসময় বরগুনার বাজার মাতিয়ে রাখত, আজ সুতার দাম, পরিবহন সমস্যায় সেই তাঁত মৃতপ্রায়। বাজার সংকুচিত, পর্যটক নেই, তাই হাতে বানানো কাপড়, ব্যাগ, শোপিস বিক্রি হচ্ছে না। বহু পরিবার তাই কর্মহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছে।

বালিয়াতলী রাখাইন পাড়ায় একসময় ৬৫টি পরিবার থাকত, এখন রয়েছে মাত্র ২৫টি। জমি ছিল প্রচুর; নানা প্ররোচনায় তা দখল হয়ে গেছে। মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়ে বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিস্থিতি আরও খারাপ। বর্ষা এলেই বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে সব ঘরে; শিশুরা অসুস্থতায় ভোগে, মানুষের জীবন থেমে যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থা এতই নাজুক যে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও দূরে যেতে হয়। শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে, শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে যায়, কেউ কেউ আবার কাজও পায় না।

পায়রা নদী পার হয়ে তালতলীর রাখাইন পল্লীতে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য আছে বটে, কিন্তু সেখানেও সমস্যার শেষ নেই। প্রাচীন বিহারে ছিল দুর্লভ মূর্তি। চুরি ও পাচারে অনেক মূল্যবান নিদর্শন হারিয়ে গেছে। পর্যটকের আনাগোনা কমে গেছে, ফলে তাঁতশিল্প আরও সংকটে পড়েছে। কাঁচামালের দাম বাড়ছে, যাতায়াত সব মিলিয়ে একসময়ের সমৃদ্ধ কারুশিল্প আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

রাখাইন ভাষা শিক্ষা প্রায় দাঁড়িয়ে গেছে মৃতপ্রায় অবস্থায়। অতীতে প্রতিটি পাড়ায় কিয়াং থাকত, ভাষা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। সরকারি সহায়তা না থাকায় সেসব ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন প্রায় নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা বলতে পারে, কিন্তু লিখতে পারে না, এ যেন সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তির ক্ষয়। অথচ তিনশ বছরের ইতিহাস বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই জনগোষ্ঠী। তাদের ঘরবাড়ি, বিহার, পাহাড়ি নকশার ঘর, হস্তচালিত তাঁতের শব্দ, কাঠের নৌকা সবই বরগুনার ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সেই মানুষগুলো এখন নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে বাঁচছে। কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান নেই, জমি দখল, মামলা-মোকদ্দমা, যোগাযোগ সমস্যা সব মিলিয়ে তারা এক অবিরাম সংগ্রামের ভেতর বাস করছে।

স্থানীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশ, তাঁতশিল্পের পুনরুজ্জীবন, বাজার তৈরি, অনলাইন বাণিজ্য, ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, সুদমুক্ত ঋণ এসব উদ্যোগ রাখাইনদের আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে। মোহনা পর্যটন কেন্দ্র, শুভসন্ধ্যা সৈকত, সোনাকাটা ইকোপার্ককে কেন্দ্র করে পর্যটন বাড়লে এর সরাসরি সুফল পাবে রাখাইন পরিবারগুলো। তাদের সংস্কৃতি, হস্তশিল্প আর ধর্মীয় ঐতিহ্য এ অঞ্চলের পর্যটনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে।

একদিন যারা নীল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আরাকান থেকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল, তারা আজ স্বপ্নহারা হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। অথচ তারা ভিক্ষুক নয়, তারা পরিশ্রমী, মর্যাদাবান একটি জাতিগোষ্ঠী। তারা শুধু টিকে থাকার সুযোগ চায়। চায় নিজস্ব শিল্পকে বাঁচানোর সুযোগ, ভাষাকে রক্ষার সুযোগ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ।

উপকূলের প্রতিটি বাতাসে এখন শোনা যায় রাখাইন পল্লীর নীরব আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ কেবল দারিদ্র্যের নয়, এটি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের, বিলীন হতে থাকা ইতিহাসের এবং এক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অবলুপ্তির হাহাকার।

যদি এখনই টেকসই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে প্রাচীন রাখাইন জনপদ, তাদের শিল্প-সংস্কৃতি, ভাষা আর তিন শত বছরের মানবিক বর্ণিল ইতিহাস সবই অচিরে হারিয়ে যাবে উপকূলের নোনা পানিতে।

শাহ্/জা/জ

এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!