সর্বশেষ আপডেট

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বরগুনায় কৃষি, আবাসন ও জীবিকা হুমকিতে

  • আপডেট হয়েছে : Saturday, December 6, 2025
  • 582 বার দেখেছেন

 জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা,বরগুনা:

সাগর উপকূলীয় জেলা বরগুনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। সমুদ্রস্তর বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বিস্তারের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন জেলার কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামোকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে বহুমুখী বিপর্যয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর মুখী অবস্থানের কারণে বরগুনা দেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জেলার মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় পোল্ডার এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নিয়মিত জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। এতে একদিকে উর্বর মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আবাদি জমিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে।

কৃষকরা জানান, বর্ষা মৌসুমের অস্বাভাবিকতা ও নোনা পানির প্রভাবে আমন ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উৎপাদন কমে গেছে। বহু এলাকায় একসময় যে জমিতে দুই থেকে তিন মৌসুমে চাষ হতো, এখন সেখানে এক মৌসুমও স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না।

জেলাটিতে নদীভাঙন দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর তীব্রতা আরও বেড়েছে। পায়রা, বিষখালী, বলেশ্বরসহ বিভিন্ন নদীর তীরবর্তী জনপদে প্রায়ই ভূমি ধসে বসতবাড়ি, ঘরবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবারগুলো বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও সুরক্ষা কাঠামোর দ্রুত মেরামত না হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির সংকটও গুরুতর রূপ নিয়েছে। ৯০% ভাগ নলকূপে পানি ওঠে না, আবার অনেক স্থানে যে পানি পাওয়া যায় তা লবণাক্ত হওয়ায় ব্যবহারযোগ্য থাকে না। এতে গ্রামীণ জনপদে সুপেয় পানির ওপর নির্ভরতা কমে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়াচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বরগুনার মানুষের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ও ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বাসস্থান ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের চাপও বাড়ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, বেড়িবাঁধ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় সেবা প্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে। দুর্যোগের পর অনেক পরিবার দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না, জীবিকা হারানো মানুষদের সামনে দেখা দেয় নতুন সংগ্রাম।

মৎস্যজীবীরাও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখোমুখি। সমুদ্রে অস্বাভাবিক ঢেউ, ঝড়ের পূর্বাভাসের ঘনঘটা, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় তাদের কর্মঘণ্টা কমে গেছে এবং আয়ে ধস নেমেছে। নদী-খালে মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও মাছের সরবরাহে প্রভাব পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত এসব সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা টেকসই সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সংস্কার, বিকল্প সুপেয় পানির উৎস সৃষ্টি, লবণ সহনশীল ফসল চাষ সম্প্রসারণ, নদীভাঙন প্রবণ এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে পূর্বপ্রস্তুতি জোরদার ও অভিযোজন-ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদও উঠে এসেছে।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব দিন দিন বাড়ছে এবং এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের ঝুঁকি। তাই বরগুনার মতো উপকূলীয় এলাকায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!