সর্বশেষ আপডেট
তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যঝুঁকি, নতুন সরকারের প্রতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান” উপকূল স্পেশালাইজড ডেন্টাল কেয়ারের উদ্যোগে বরগুনায় ওরাল হেলথ ও ডেন্টাল অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্প অনুষ্ঠিত আর ডি এফ এর সেফগার্ডিং সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট, যুবক গ্রেপ্তার। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ চূড়ান্ত হলো ২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮ দল, কোন গ্রুপে কে? কেএসডিও দিলো ২০০ পরিবারকে ইফতার সামগ্রী পাকিস্তানের সামনে আজ যে কঠিন সমীকরণ ঢাকা ও নরসিংদীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জাতি স্তম্ভিত: জামায়াত আমির রামপুরায় শিশু হত্যা: বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস নাহিদ ইসলামের

উন্নয়ন বঞ্চিত বরগুনা: সম্ভাবনার জেলায় স্থবিরতার দীর্ঘ ছায়া

  • আপডেট হয়েছে : Saturday, December 6, 2025
  • 803 বার দেখেছেন
উপকূলীয় জেলা বরগুনা দেশের সবচেয়ে নবীন ও ভৌগোলিকভাবে পরিবর্তনশীল জনপদগুলোর অন্যতম। সমুদ্রগর্ভে সৃষ্ট নতুন ভূমি, নদীবিধৌত সমতল এবং সামুদ্রিক সম্পদসমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই জেলাকে একটি অনন্য সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও এই সম্ভাবনা কাঙ্ক্ষিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, মৎস্য, দুর্যোগ প্রস্তুতি সবক্ষেত্রেই উন্নয়নের গতি মন্থর। এর ফলে বরগুনা আজো দেশের উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে থাকা জেলার তালিকায় অবস্থান করছে।
বরগুনার অবকাঠামো উন্নয়নের চিত্র বেশ নাজুক। জেলার বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে সংযোগ সড়কগুলো অনেকাংশেই ভাঙাচোরা। গ্রামীণ সড়কের বড় অংশ এখনো কাঁচা বা অর্ধপাকা। বর্ষা মৌসুমে বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বরগুনায় অত্যন্ত বেশি। যা সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তোলে। এই দুরবস্থার কারণে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে কৃষিজাত শাকসবজি ও উপকূলের সামুদ্রিক মাছ বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং বড় পরিসরে ক্ষতি হয় স্থানীয় অর্থনীতিতে।
জেলার স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অপ্রতুলতা স্পষ্ট। সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে মানসম্মত সেবা সবসময় পাওয়া যায় না। দ্বীপ ও চরাঞ্চলের মানুষদের জরুরি চিকিৎসার জন্য নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা জীবন ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বরগুনায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষদের বরিশাল বা ঢাকা শহরে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
শিক্ষাখাতে বরগুনার উন্নয়নও থমকে আছে। জেলার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা এখনো অর্জিত হয়নি। শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধার অভাব, আধুনিক পাঠদানের উপকরণের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাজীবন ঝরে পড়া, এসব সমস্যাই এখানে দীর্ঘদিনের। তাছাড়া উপকূলীয় দুর্যোগে বিদ্যালয়ের ভবন বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে।
বরগুনার মৎস্যসম্পদের প্রসার দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাথরঘাটা দেশের অন্যতম বৃহৎ সমুদ্রকেন্দ্রিক মৎস্য অঞ্চল। কিন্তু মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ধীর গতিতে চলছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। সমুদ্রে আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য ও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। একইসঙ্গে কৃষিখাতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
বরগুনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো নদীভাঙন। জেলার চারপাশ ঘিরে থাকা বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদীর ভাঙন প্রতিবছর শত শত পরিবারকে গৃহহারা করছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী বাঁধ এখনো নির্মাণ করা যায়নি বা যেগুলো হয়েছে সেগুলোও অনেক ক্ষেত্রে টেকসই নয়। ভূমি হারানো, পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা ও জীবিকা হারানোর দুশ্চিন্তা হাজারো পরিবারকে স্থায়ী ঝুঁকিতে রাখে।
দুর্যোগপ্রবণতার কারণে বরগুনার উন্নয়নের পথে অতিরিক্ত বাধা সৃষ্টি হয়। সিডর, আইলা, ফণী, রোয়ানু প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় বরগুনায় ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রের ঘাটতি এবং তাদের দূরবর্তী অবস্থান অনেক মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। দুর্যোগোত্তর পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিপাকে পড়ে।
জেলার মানুষের মূল দাবি হলো স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা বৃদ্ধি, মৎস্যশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন। তারা মনে করেন, বরগুনাকে একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় না আনলে এ জেলার সম্ভাবনা বাস্তবায়ন অসম্ভব।
প্রকৃতি বরগুনাকে যেভাবে বিপুল সম্পদ দিয়েছে, সেই সম্পদ টেকসইভাবে কাজে লাগাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণা-ভিত্তিক, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বরগুনাকে একটি সম্ভাবনাময় জেলার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এখন প্রয়োজন সচেতন পরিকল্পনা, নির্ভুল বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন বঞ্চনার দীর্ঘ ছায়া থেকে মুক্তির দৃঢ় প্রত্যয়।
শাহ্/জা/জ
এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!