সর্বশেষ আপডেট
পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মুখস্থের সাফল্য, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে কেন ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা? বরগুনায় এমইপি গ্রুপের সহযোগী সম্মেলন অনুষ্ঠিত সংরক্ষিত বনে কেওড়া গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা মামলায় ইউপি সদস্যসহ ৫ জন জেলে তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যঝুঁকি, নতুন সরকারের প্রতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান” উপকূল স্পেশালাইজড ডেন্টাল কেয়ারের উদ্যোগে বরগুনায় ওরাল হেলথ ও ডেন্টাল অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্প অনুষ্ঠিত আর ডি এফ এর সেফগার্ডিং সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট, যুবক গ্রেপ্তার। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ চূড়ান্ত হলো ২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮ দল, কোন গ্রুপে কে? কেএসডিও দিলো ২০০ পরিবারকে ইফতার সামগ্রী

পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মুখস্থের সাফল্য, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে কেন ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা?

  • আপডেট হয়েছে : Tuesday, July 14, 2026
  • 42 বার দেখেছেন

পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মুখস্থের সাফল্য, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে কেন ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা?

কবির হোসাইন
সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নীরব সংকট বহু বছর ধরে বেড়ে উঠছে। সংকটটি এতটাই সাধারণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যে আমরা একে প্রায় স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। তাদের অনেকেই প্রাথমিক স্তরে ভালো ফলাফল অর্জন করে, বৃত্তি পায়, বিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় স্থান করে নেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। কেউ আত্মবিশ্বাস হারায়, কেউ বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতায় ভোগে, আবার কেউ ধীরে ধীরে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন হলো, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে শিক্ষার্থীকে মেধাবী বলা হচ্ছিল, ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সে কেন সংগ্রাম শুরু করে?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিতের দিকে তাকাতে হবে।

মুখস্থ বিদ্যার অদৃশ্য ফাঁদ

দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখনও শিক্ষার প্রধান সূচক হিসেবে পরীক্ষার নম্বরকে বিবেচনা করা হয়। ফলে শিক্ষাদানের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ভালো ফলাফল অর্জন, প্রকৃত শিক্ষা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু অনুধাবন না করেই প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো “জলচক্র” সম্পর্কে পাঁচ নম্বরের উত্তর নিখুঁতভাবে লিখতে পারে, কিন্তু তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কেন বৃষ্টি হয় বা মেঘ কীভাবে তৈরি হয়, তখন সে ব্যাখ্যা দিতে পারে না। গণিতে সূত্র মুখস্থ আছে, কিন্তু বাস্তব সমস্যায় প্রয়োগ করতে পারে না। বাংলা বা ইংরেজিতে রচনা মুখস্থ আছে, কিন্তু নিজের ভাষায় কয়েকটি সুসংগঠিত বাক্য লিখতে পারে না।

এটি কেবল শিক্ষার্থীর সীমাবদ্ধতা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়েই কেন ধাক্কা?

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার প্রকৃতির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে।

প্রাথমিক স্তরে সাধারণত শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় তথ্য। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, প্রয়োগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে শুধু “কি” জানতে হয় না, “কেন” এবং “কিভাবে” সেটিও জানতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে বিজ্ঞান বিষয়কে ধরা যেতে পারে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী একটি সংজ্ঞা মুখস্থ করে নম্বর পেতে পারে। কিন্তু মাধ্যমিকে তাকে ধারণা বুঝে ব্যাখ্যা করতে হয়। একইভাবে গণিতে মুখস্থ সূত্রের পরিবর্তে যৌক্তিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।

ফলে মুখস্থ নির্ভর শিক্ষার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বিপাকে পড়ে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা কী বলছে?

বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো “লার্নিং ক্রাইসিস” বা শেখার সংকট।

শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

বিশ্বব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শিক্ষার্থী কয়েক বছর বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পরও বয়স উপযোগী পাঠ দক্ষতা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রকৃত শিক্ষাগত দক্ষতা অর্জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

এটি শুধু শিক্ষার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

নম্বরের সংস্কৃতি বনাম শিক্ষার সংস্কৃতি

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক চাপগুলোর একটি হলো নম্বর।

অভিভাবক জানতে চান সন্তান কত নম্বর পেল। শিক্ষক মূল্যায়িত হন শিক্ষার্থীর ফলাফলের মাধ্যমে। বিদ্যালয়ের সুনামও নির্ধারিত হয় পরীক্ষার ফল দেখে।

কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা হয়—

শিক্ষার্থী কি বুঝে শিখেছে?

সে কি নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে?

সে কি নতুন সমস্যা সমাধান করতে পারে?

সে কি যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে পারে?

যখন নম্বরই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।

কোচিং নির্ভরতা ও সৃজনশীলতার সংকট

শিক্ষাবিদদের মতে, মুখস্থ নির্ভর শিক্ষার আরেকটি কারণ হলো অতিরিক্ত কোচিং সংস্কৃতি।

অনেক ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারগুলো সম্ভাব্য প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করে। শিক্ষার্থীরা সেগুলো মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এতে পরীক্ষায় সফলতা আসতে পারে, কিন্তু শেখার গভীরতা তৈরি হয় না।

ফলাফল হিসেবে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে দুর্বল থেকে যায়।

একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা—সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং সৃজনশীলতা—এসবের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

শিক্ষক কি একা দায়ী?

অনেকেই এই সংকটের জন্য সরাসরি শিক্ষকদের দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।

একজন শিক্ষককে অনেক সময় বড় আকারের শ্রেণিকক্ষ সামলাতে হয়। প্রশাসনিক কাজ, মূল্যায়ন, বিভিন্ন দাপ্তরিক দায়িত্ব এবং ফলাফলের চাপের মধ্যেও পাঠদান করতে হয়।

অন্যদিকে অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার কিংবা প্রযুক্তিগত সুবিধাও নেই।

ফলে শিক্ষক অনেক সময় বাধ্য হয়েই সহজতম পদ্ধতি—মুখস্থভিত্তিক শিক্ষার আশ্রয় নেন।

সুতরাং সমস্যাটি ব্যক্তি নয়; বরং ব্যবস্থার।

করণীয় কী?

প্রথমত, প্রাথমিক স্তর থেকেই পাঠ বোঝার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করা যায়।

তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে পাঠাগার কার্যক্রম, বিজ্ঞান ক্লাব, গণিত ক্লাব, বিতর্ক, বই পড়া ও প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।

পঞ্চমত, অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। সন্তান কত নম্বর পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কতটুকু শিখল।

শেষ কথা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং শেখার মানের ঘাটতি।

একজন শিক্ষার্থী যদি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মুখস্থ করে সফল হয়, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে সমস্যা শিক্ষার্থীর নয়—সমস্যা শিক্ষাব্যবস্থার ভিতেই রয়েছে।

আমরা যদি সত্যিকার অর্থে দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তাহলে প্রথম শ্রেণি থেকেই মুখস্থ বিদ্যার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অন্যথায় প্রতি বছর নতুন নতুন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে একই দেয়ালে ধাক্কা খাবে, আর আমরা সেই ব্যর্থতার জন্য তাদেরই দায়ী করতে থাকব।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নম্বর নয়; শেখা। আর শেখার সেই ভিত্তি দুর্বল থাকলে ভবিষ্যতের পুরো কাঠামোই একদিন নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

এ বিভাগের আর খবর
Developed by:  ©২০২৬ জাগ্রত জনতা কর্তৃক সকল স্বত্ব সংরক্ষিত
error: Content is protected !!