জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা, বরগুনা:
বরগুনার আমতলী উপজেলার সুবন্ধি খাল ছিল একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ২৬টি গ্রামের জীবনরেখা। পানি নিষ্কাশন, নৌযান চলাচল, সেচব্যবস্থা, মাছ আহরণ এবং দৈনন্দিন পানির চাহিদা-সবই পূরণ হত এই খালকে কেন্দ্র করে। কিন্তু দীর্ঘ অবহেলা, দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং বছরের পর বছর কচুরিপানায় আটকে থাকা পানিপ্রবাহ আজ খালটিকে মৃতপ্রবাহে পরিণত করেছে। পানিবদ্ধতা, দুর্গন্ধ, রোগবালাই এবং পানিসঙ্কটে দুই পাড়ের আড়াই লাখ মানুষের জীবনচক্র আজ বিরূপ বাস্তবতার মুখোমুখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাওড়া খাল ও সুবন্ধি অংশ মিলিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে খালের বেশিরভাগই কচুরিপানায় ঢেকে রয়েছে। কোথাও বোঝার উপায় নেই এটি খাল, নাকি সবুজের বিছানো একটি প্রান্তর। বর্ষায় পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমতলী পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড, সদর ইউনিয়নের ছুরিকাটা, মহিষডাঙ্গা, নাচনাপাড়া, আড়–য়া বৈরাগী, চলাভাঙ্গা, হলদিয়া ইউনিয়নের কাউনিয়া, রামজি, ঘুঘুমারি, লক্ষী, রাওঘাসহ অন্তত ২৬টি গ্রামের সড়ক জলমগ্ন থাকে ঘনঘন। স্থানীয়দের চলাচল ব্যাহত হয়, শিক্ষার্থী ও রোগীদের যাতায়াত হয় মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। শুকনো মৌসুমে খালের পানি স্থির হয়ে পচে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে; মশা-মাছির বিস্তার ও পানিবাহিত রোগ বাড়ে। গবাদিপশুর গোসল বা পুকুরের অভাবে পানি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে-ফলে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে দূষিত পানির ওপর নির্ভর করে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই দুরবস্থার মূল সূত্র ১৯৮৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত একটি বাঁধ। তখন সুবন্ধি অংশটি খোলা রেখে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে স্থানীয় আপত্তি উপেক্ষা করে সেই মুখও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে চাওড়া ও সুবন্ধি খালের ভেতরের বিশাল এলাকায় পানির গতিপথ সম্পূর্ণ থেমে যায়। সময়ের সাথে সাথে মূল খালসহ ২০টিরও বেশি শাখা খাল মৃতপ্রবাহে পরিণত হয়; কচুরিপানা জমে খালগুলো ভরাট হয়ে যায়। কৃষিপ্রধান অন্তত ১৫টি গ্রামের বিশাল জমিতে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; বর্ষায় পানিবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হয়, শুকনো মৌসুমে পানি সঙ্কটে ভোগেন হাজার হাজার মানুষ।
এদিকে ২০২১ সালে কচুরিপানা অপসারণে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তিতে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলাফল-সমস্যা আরও জটিল হয়ে আজ মানবিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। খালের ওপর নির্মিত কয়েকটি নিচু সেতু ও অপরিকল্পিত কাঠামো পানিপ্রবাহকে আরও বাধাগ্রস্ত করেছে। কোথাও কোথাও সেতুর নিচে প্রয়োজনীয় ফাঁকা না থাকায় বর্ষার চাপ সহ্য করতে না পেরে খালের পাড় ধসে বাড়িঘর ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হান্নান প্রধান জানান, বর্তমানে সংযোগ খালগুলোর খননকাজ শুরু করলেও সুবন্ধি খাল এখনো পূর্ণাঙ্গ সংস্কার-অপেক্ষায়। খাল পুনঃখনন, কচুরিপানা অপসারণ, দখল উচ্ছেদ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং বাধানির্মাণজনিত ভুল সংশোধন ছাড়া এই অঞ্চলের পানিবদ্ধতা ও পানিসঙ্কট কেটে যাবে।
ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড খালের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকাজের জন্য ৭৫৬ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। জেলা প্রশাসনও প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতায় সমস্যা দিনদিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সুবন্ধি খাল এখন কেবল একটি পানিপথ নয়; এটি দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, কৃষি, পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক প্রয়োজন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না এলে সুবন্ধি খাল-সংকট ভবিষ্যতে বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে-এটাই এখন আমতলীর মানুষের সবচেয়ে বড় শঙ্কা।
শাহ্/জা/জ